প্রকাশিত:
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৮:৩১
প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ ও বারবার ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানার পরেও দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে অবৈধ বালু উত্তলনকারীদের দৌরাত্ম্য।
কোনো এক অপশক্তি ব্যবহার করে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু উত্তলন করে জেলা শহর সহ বিভিন্ন এলাকায় ট্রাকের ট্রাক বালু পাঁচারের মাধ্যমে ব্যাপক বানিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে একটি অসাধু মহল।
এদিকে নেত্রকোণা জেলা প্রশাসন অবৈধভাবে বালু উত্তলন ও বানিজ্য বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিলেও প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিভিন্ন কায়দায় রাতের আঁধারে এবং দিনে-দুপুরে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের এই অবৈধ বানিজ্য।
মূলত কতিপয় কিছু ব্যক্তি প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় জেলার নদ-নদীতে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চালিয়ে যাচ্ছে। এসবের পরেও অসহায়ের মত তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছু করা সাধ্য নেই জনসাধারণের।
এতে নদীর তীর ভেঙে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে বহু পরিবার। অভিযোগ জানিয়েও মিলছে না কোনো প্রতিকার। এমনটাই বক্তব্য তাদের। তবে প্রশাসন বলছে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। শুধু তাই নয়, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হওয়ায় জেল-জরিমানাও বাড়ছে।
সাম্প্রতি সময়ে নেত্রকোণার বিভিন্ন উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের জেল ও জরিমানাও করা হচ্ছে। এমনকি দিনে বা রাতের আঁধারে ট্রাক ভর্তি অবৈধ বালুর গাড়িও মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে করা হচ্ছে জরিমানা। অবৈধ বালু উত্তোলনকারী এবং বালু ব্যবসায়ীদের ১ থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং এক মাসের কারাদণ্ডও দেওয়া হচ্ছে।
প্রশাসন এই অভিযান অব্যাহত রাখবে এবং ভবিষ্যতে এই অপরাধে কেউ জড়ালে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলে হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের কঠোর হুশিয়ারির পরেও দেদারসে চলছে রমরমা বালু বানিজ্য।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, গত ৫ আগষ্টের পর রাতারাতি রাজনৈতিক পরিচয় পাল্টিয়েছে বালু সিন্ডিকেটের বড় একটি চক্র। যারা আগে ব্যবহার করেছে আওয়ামী লীগের নাম, এখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নাম ভাঙিয়ে বালু সিন্ডিকেট চক্রটি তাদের রমরমা বালু বানিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
দেখা যায়, জেলায় ইজারা বিহীন দূর্গাপুরের বিভিন্ন এলাকা এবং কলমাকান্দা উপজেলার ডামরিখলা, বড়ুয়াকোণা, পাতলাবনসহ অনেক এলাকা থেকে রাতের আঁধারে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তলন করে নৌকা যুগে বারহাট্টার তেগুড়িয়া বাজারে নিয়ে আসে। পরে বাজার সংলগ্ন মাদ্রাসার মাঠ থেকে ড্রাম ট্রাকে করে জেলার বিভিন্ন জায়গায় পাঁচারের মাধ্যমে চালিয়ে যাচ্ছে রমরমা বানিজ্য।
বিভিন্ন সময় জেলার সংবাদিকরা এই অপকর্মের সংবাদ তুলে ধরতে গেলে তাদেরকে বিভিন্ন ভাবে ভয়-ভীতি দেখানো হয়। এমনকি একাধিকবার সাংবাদিকদের উপর বালু উত্তলনকারীদের সন্ত্রাসী বাহিনী দ্বারা হামলার মত অপ্রীতিকর ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখতে পাওয়া গেছে।
বিশেষ করে বারহাট্টা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের তেগুড়িয়া বাজারে স্থানীয় সন্ত্রাসী একটি চক্র রাজিব, কাইয়ুম, নাজমুল, লালন খান, মাহাবুব, সাফায়েত, ফারুকসহ ওই চক্রের সদস্যরা মিলে এলাকার সাধারণ মানুষদের জিম্মি করে দীর্ঘদিন ধরে এই বালু উত্তলন ও বানিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। এলাকার সাধরণ জনগন এই অবৈধ কাজে বাঁধা দিতে গেলে হুমকিধামকি ও ভয় ভীতি দেখানো হয় তাদের। এসব কথা জানিয়েছেন তেগুড়িয়া এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রাজনৈতিক ব্যক্তি।
এছাড়াও রায়পুর ইউনিয়নের, ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি গোলাপ ফকির জানায়, দীর্ঘদিন ধরে সরকারের নির্দেশ অমান্য করে অবৈধভাবে বালু উত্তলন করে গাড়ির গাড়ি বালু পাঁচারের মাধ্যমে এই বানিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে পুরো জেলায়।
এলাকার এই চক্রটি রাতের আঁধারে ক্ষমতার দাপটে কলমাকান্দার ইজারা বিহীন বিভিন্ন জায়গা থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তলন করে বারহাট্টা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের তেগুড়িয়া বাজারের পাশে মাদ্রাসার ঘাটে নিয়ে আসে। পরে এখান থেকে ড্রামট্রাক আর লড়ির মাধ্যমে রাতের আঁধারেই আবার নেত্রকোণা সদর সহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করে থাকে। আমরা সামাজিক ভাবে এই চক্রটিকে বাঁধা দিয়েও শুনানো যাচ্ছেনা তাদের। বরং আমাদেরকে উপর মহলের লোকজন দিয়ে হুমকি ধামকি দেওয়ানো হয়।
এমনকি প্রায় সময়েই সাংবাদিকেরা তাদের এই অবৈধ কাজকর্মের সংবাদ তুলে ধরার উদ্দেশ্যে ঘটনাস্থলে আসলে তাদের উপর হামলা চালিয়ে সামাজিকভাবে লাঞ্চিত করে এই স্থানীয় চক্রটি।
বারবার বিষয়টি জানানোর পরেও কেনো নিরব ভূমিকা পালন করছে বারহাট্টা উপজেলা প্রশাসন ও থানার পুলিশ এমনটা প্রশ্ন এলাকাবাসীর মনে।
শুধু এখানেই শেষ নয় গত ৫ আগস্টের পর থেকে এই চক্রের মূল হোতারা নেত্রকোণা শহরের পূর্ব চকপাড়া এলাকার খাইরুল, মঈনপুর এলাকার লিটন, স্বপন ও অবৈধ নির্বাচনে মাধ্যমে নির্বাচিত জেলা শ্রমিক ইউনিয়নের কিছু সদস্যসহ পর্দার অন্তরালে থেকে অনেক রাজনৈতিক নেতারা মিলে এই অবৈধভাবে বালু উত্তলন বানিজ্যের সিন্ডিকেটটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।
এবিষয়ে, নেত্রকোণা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জামান জানান, রাতের আঁধারে জেলার বিভিন্ন নদ-নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তলনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বালু উত্তলন বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। যেখানেই অবৈধ বালু উত্তলনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাদের জেল-জরিমানা করা হচ্ছে। এবং অবৈধ উত্তলনকৃত বালু বহনকারী গাড়ি গুলোকেও জরিমানা করা হচ্ছে। অবৈধভাবে বালু উত্তলন বন্ধের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
মন্তব্য করুন: