প্রকাশিত:
১৪ অক্টোবর ২০২৫, ১৫:০০
চট্টগ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত পারকি সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশের একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই সৈকত বহু বছর ধরে স্থানীয় বাসিন্দা ও ভ্রমণপিপাসুদের অন্যতম গন্তব্যস্থল হয়ে উঠেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই সৈকতের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সৈকতের আশপাশে গড়ে ওঠা ঝাউবনের একাংশে গাছ কাটার ঘটনা ঘটছে, যা পরিবেশপ্রেমী এবং সচেতন মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
জানা যায়, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পারকি সৈকতের বিভিন্ন স্থানে গাছ কাটা হচ্ছে। বিশেষ করে ঝাউ গাছগুলো যেগুলো একসময় সৈকতের সৌন্দর্য এবং পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত, তা একের পর এক কেটে ফেলা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সৈকতের সৌন্দর্য বৃদ্ধির নামে এই গাছ কাটা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে, প্রকৃতপক্ষে তারা কোন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে এটি করছেন কি না, সে ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পারকি সৈকতের ঝাউবন শুধু সৌন্দর্যের অংশ নয়, এটি সৈকতের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমুদ্র থেকে আসা ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে সৈকত রক্ষার পাশাপাশি এই গাছগুলো বিভিন্ন পাখি, ছোট প্রাণী ও কীটপতঙ্গের আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও, এই গাছপালা সৈকতের বালু ধরে রাখতে সাহায্য করে, যা ভাঙন রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
স্থানীয় এক পরিবেশকর্মী জানান, “এই গাছগুলো কাটার পেছনে কারা রয়েছে, তা পরিষ্কার নয়। কেউ কেউ বলছেন যে এটি ‘সৌন্দর্য বৃদ্ধির কাজ’—কিন্তু প্রকৃতপক্ষে গাছ কেটে কীভাবে সৌন্দর্য বাড়ে, তা আমাদের বোধগম্য নয়। বরং গাছ থাকলে পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত থাকে, ছায়া তৈরি হয়, আর এটি সৈকতের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে।”সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সৈকতের কিছু এলাকায় মাটির ওপর ঝাউ গাছ কাটা পড়েছে, এবং গাছ কেটে ফেলার পরে কোন পুনরোপণ বা মাটির সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে বালুকাময় এই এলাকায় ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমনকি কিছু অংশে ইতোমধ্যেই বালু সরে গিয়ে নিচের মাটি দেখা যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, পারকি সৈকতকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা শোনা যাচ্ছে। পর্যটকদের সুবিধার্থে রাস্তা, দোকানপাট, রিসোর্ট নির্মাণসহ নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে, অনেক ক্ষেত্রেই এই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সঠিক পরিবেশগত মূল্যায়ন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে করে প্রাকৃতিক পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষক জানান, “ঝাউবন বা যেকোনো উপকূলীয় গাছপালা কাটা হলে তা সাময়িকভাবে জায়গা খালি করতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। সৈকতের বালু ধরে রাখার প্রাকৃতিক ব্যবস্থাটি নষ্ট হয়ে গেলে সেখানে ভূমি ক্ষয়, জলোচ্ছ্বাস প্রবণতা ও জীববৈচিত্র্েযর ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে।”
এদিকে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ব্যাপারে এখনো কোন আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি। তবে, সচেতন নাগরিকরা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা চায়, গাছ কাটার ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। সেই সাথে, নতুন করে গাছ লাগানো ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
বর্তমানে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ পরিবর্তন এবং জলবায়ু সংকটের প্রেক্ষাপটে, পারকি সৈকতের মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যবাহী স্থানগুলো সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কোনো ধরনের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড শুধু স্থানীয় পরিবেশ নয়, বরং বৃহৎ পরিবেশ ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, পারকি সৈকত শুধু একটি ভ্রমণ গন্তব্য নয়, এটি একটি প্রাকৃতিক সম্পদ। এই সম্পদের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হবে আগামী প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়িত্ব। নাহলে আমরা শুধু একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, বরং একটি বাস্তুতন্ত্রকেও হারাতে বসব।
মন্তব্য করুন: