প্রকাশিত:
১৯ নভেম্বর ২০২৫, ১৭:৫৩
নেত্রকোণাসহ বৃহত্তর হাওর অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান জলবায়ু সংকট কৃষকদের জীবিকা, নিরাপত্তা ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় গুরুতর প্রভাব ফেলছে। ফসলরক্ষা বাঁধ ভাঙন, আগাম বন্যা, তাপদাহ, অতিবৃষ্টি, ঘন কুয়াশা, মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া, রাসায়নিকের অতিরিক্ত ব্যবহারসহ হাওরবাসীর দিনযাপন তাই প্রতিদিনই কঠিন হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় টিকে থাকার লড়াইয়ে স্থানীয় অভিযোজন কৌশলই ভরসা—এমন ধারণা উঠে এসেছে এক কর্মশালায়।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক এবং দাতা সংস্থা অক্সফামের সহযোগিতায় “কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা: স্থানীয় নেতৃত্বে অভিযোজন” শীর্ষক সাংবাদিক কর্মশালার আয়োজন করা হয়। শনিবার নেত্রকোনার মদন উপজেলায় অনুষ্ঠিত কর্মশালায় মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরি, কলমাকান্দা, দূর্গাপুর ও আটপাড়া থেকে আগত ২০ জন সাংবাদিক অংশ নেন।
কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. অহিদুর রহমান এবং প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সহযোগী সমন্বয়কারী শংকর ম্রং। সভাপতিত্ব করেন মদন উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি সামছুল আলম ভূইয়া। সঞ্চালনা করেন মাঠ সহায়ক আব্দুর রব।
হাওরবাসীর চ্যালেঞ্জ সাংবাদিকদের দলীয় আলোচনায় হাওর এলাকার নানামুখী সংকট উঠে আসে। এর মধ্যে রয়েছে—আগাম বন্যায় ধান ক্ষতি, ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি, স্থানীয় বীজের ঘাটতি, বর্ষায় সবজির বাজার নির্ভরতা, গোচারণভূমি সংকট, ঘন কুয়াশা, ঠান্ডা ও তাপদাহে ফসলহানি, বসতভিটার ক্ষয়, মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া, পোকার আক্রমণ বৃদ্ধি, রাসায়নিক সার-বিষের অতিরিক্ত ব্যবহার, সেচের পানির সংকট, বসতভিটা ডুবে গাছপালা নষ্ট হওয়া, জ্বালানির ঘাটতি, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা, চায়না দুয়ারী জালে মাছ ও জলজ প্রাণী ধ্বংস, অতিবৃষ্টি ও জলবায়ুগত পরিবর্তনের তীব্র প্রভাব।
আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. অহিদুর রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হাওরের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে। কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা ও স্থানীয় জ্ঞানভিত্তিক সমাধান ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা কঠিন হবে।
সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় অভিযোজন
সাংবাদিকরা চারটি দলে বিভক্ত হয়ে হাওরবাসীর টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অভিযোজন কৌশল চিহ্নিত করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
বসতভিটার চারপাশে হিজল, করচ, ভিন্না, মুর্তা ও উজাওড়ি রোপণ, বন্যা থেকে রক্ষায় বসতভিটা উঁচুকরণ, টাওয়ার পদ্ধতি, ভাসমান বেড, বস্তায়, মাঁচা ও ঝুলন্ত সবজি চাষ, আগাম ধানজাত সংগ্রহ করে চাষ, বর্ষাকালের জন্য জ্বালানি, শুটকি ও হিদল সংরক্ষণ, বড়ই, তেঁতুল, জলপাই প্রক্রিয়াজাত করে রাখা, হাঁসচাষসহ পানি নির্ভর কৃষি, জৈববালাইনাশক তৈরি ও ব্যবহার, উঁচু মাঁচার ঘর নির্মাণ, দুর্যোগের আগাম প্রস্তুতি, বর্ষায় বাড়ির উঠানে বীজতলা তৈরির কৌশল, স্থানান্তরিত চুলা ব্যবহারও ‘উগার’ পদ্ধতিতে খড় সংরক্ষণ।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন হাওরের মানুষের জীবনযাত্রায় গভীর চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তবে স্থানীয় উদ্ভাবন, লোকজ জ্ঞান ও কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা ভিত্তিক অভিযোজন কৌশলকে বিস্তৃতভাবে প্রয়োগ করা গেলে হাওরবাসী ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় আরও সক্ষম হবে।
হাওরের কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রা রক্ষায় শুধু বড় প্রকল্প বা অবকাঠামো নয়—স্থানীয় মানুষের জ্ঞানভিত্তিক সমাধানই পারে দীর্ঘস্থায়ী টেকসই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। কর্মশালা তাই বার্তা দিয়েছে—হাওরকে বাঁচাতে হলে হাওরের মানুষকে শক্তিশালী করতেই হবে।
মন্তব্য করুন: