বৃহঃস্পতিবার, ২৩শে এপ্রিল ২০২৬, ১০ই বৈশাখ ১৪৩৩ | ই-পেপার
ব্রেকিং নিউজ:
  • সারাদেশে উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আগ্রহী হলে আপনার সিভি ই-মেইল করতে পারেন। ই-মেইল nagorikdesk@gmail.com
সংবাদ শিরোনাম:
  • সংবিধানের দোহাই আর নয়, আমরা ফ্যাসিবাদের দাফন করতে চাই
  • গুম-খুনের ব্যাপারে ট্রাইব্যুনাল সহায়তা চাইলে করা হবে : র‍্যাব ডিজি
  • ইসরায়েলের আবাসিক ভবনে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত, ২ জন নিহত
  • বিধ্বস্ত বিমানের দ্বিতীয় ক্রু উদ্ধার, তবে ইরান থেকে বের হতে পারেনি এখনো
  • ঢাকায় যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য দূত
  • প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বেসরকারি খাত উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত
  • বাসা-বাড়িতে লাইট-ফ্যান ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার খবর ভুয়া : বিএনপি
  • ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘বড় চমক’ আছে, সতর্কতা ইরানের
  • কলকাতায় হামলার হুমকি পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর
  • আমেরিকা-চীন-রাশিয়া: পররাষ্ট্রনীতিতে কোনদিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ?

পরিবর্তনে প্রতিরোধ হোক...নারী নির্যাতন

রেহানা ফেরদৌসী

প্রকাশিত:
২৫ নভেম্বর ২০২৫, ১৮:১০

আজ ২৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য: "নারী-কন্যা সুরক্ষা করি, সহিংসতা মুক্ত বিশ্ব গড়ি"

একজন মেয়ে যখন আপনার বোন, তখন আপনি তার "দায়িত্ববোধ" অনুভব করতে পারেন। তিনি যখন আপনার বন্ধু, তখন আপনি তার "আবেগ" অনুভব করতে পারেন। তিনি যখন আপনার প্রেমিকা, তখন আপনি তার "প্রবল অনুরাগ" অনুভব করতে পারেন। তিনি যখন আপনার স্ত্রী, তখন আপনি তার “ত্যাগ ও ধৈর্য" অনুভব করতে পারেন। তিনি যখন আপনার সন্তান, তখন আপনি তার "নিষ্পাপতা" অনুভব করতে পারেন। তিনি যখন আপনার মা, তখন আপনি তার “প্রকৃত ভালোবাসা" অনুভব করতে পারেন। একজন মেয়ে মহান সৃষ্টিকর্তার অন্যতম সেরা সৃষ্টি।

১৯৬০ সালের ২৫ নভেম্বর লাতিন আমেরিকার ডমিনিকান রিপাবলিকের স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য প্যাট্রিয়া, মারিয়া তেরেসা ও মিনার্ভা মিরাবেল নামে গির্জার তিনজন সিস্টারকে হত্যা করা হয়। আর এই তিন সিস্টারকে হত্যা করা হলে তাদের স্মরণে ১৯৮১ সাল থেকে এই দিনটি আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিবাদ দিবস হিসেবে পালিত হয়। এই ঘটনার স্মরণে পরবর্তীকালে ১৯৯৩ সালে ভিয়েনা মানবাধিকার সম্মেলনে নারী ও পুরুষের মধ্যে অসমতা ও বৈষম্যের কারণে সৃষ্ট জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায় এবং নারী নির্যাতন সম্পর্কিত ঘোষণা গ্রহণ করা হয়।

এই সম্মেলনে দুটি প্রত্যয় সামনে আসে, ‘নারীর অধিকার মানবাধিকার’ এবং ‘নারীর প্রতি সহিংসতা মানবাধিকার লঙ্ঘন’। ১৯৯৯ সাল থেকে জাতিসংঘ দিবসটি কেন্দ্র করে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ পালনের ঘোষণা করে। এর পর থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

বর্তমানে আগের তুলনায় নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি সহিংসতায় নতুন ধরন যুক্ত হচ্ছে। প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজন নারী জীবনে কোনো একবার নিকটতম সঙ্গী দ্বারা সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এই নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে শারীরিক, মানসিক, যৌন ও অর্থনৈতিক সহিংসতা। এর মধ্যে ৬৪ শতাংশ নারী তাদের ওপর সহিংসতার ঘটনা কখনো কাউকে বলেননি। অন্য কারো তুলনায় স্বামীদের দ্বারা শারীরিক সহিংসতার শিকার হওয়ার আশঙ্কা তিন গুণ বেশি, যৌন সহিংসতার আশঙ্কা ১৪ গুণ বেশি। এ ক্ষেত্রে বলা যায়, বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যেই শারীরিক ও যৌন সহিংসতার ঝুঁকি অধিক। তা ছাড়া সামাজিক পরিসরে তো রয়েছেই।

প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন সমাজ ও সভ্যতায় যেমন আলো ফেলছে, আবার এই প্রযুক্তিই নারীর জীবনে নতুন ধরনের সহিংসতার অভিঘাত তৈরি করছে। বাংলাদেশে ৮৯ শতাংশ নারী ও কন্যা প্রযুক্তির মাধ্যমে জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। কন্যা শিশু প্রথম সাইবার সহিংসতার শিকার হয় ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সে। ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীরা সবচেয়ে বেশি প্রযুক্তির মাধ্যমে সহিংসতার শিকার হন। এ ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ ভুক্তভোগী নারী আইনি ব্যবস্থা নেন না, তাদের পরিবারকেও এ বিষয়ে জানান না। ৫৩ শতাংশ জানে না কোথায় রিপোর্ট করতে হবে। জরিপে দেখা যায়, ছাত্রী ও অবিবাহিত নারীরা এই হয়রানির শিকার বেশি হন। যেসব নারীরা অনলাইনে অধিক দৃশ্যমান; যেমনÑরাজনীতিতে সক্রিয়, আন্দোলনকর্মী, ছাত্রী, তারা অধিক হারে সাইবার সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।

প্রযুক্তির মাধ্যমে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার ধরনগুলো হচ্ছে, সাইবার স্টকিং, হ্যাকিং, অনলাইন হয়রানি, চিত্রভিত্তিক সহিংসতা, প্রযুক্তি ভিত্তিক যৌন হয়রানি, প্রলুব্ধ করা, ফাঁদে ফেলা, বিদ্বেষমূলক ভাষা প্রয়োগ ইত্যাদি। প্রযুক্তিনির্ভর এই নির্যাতন নারী ও কন্যার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। বেশির ভাগ ভুক্তভোগী পরিবার সামাজিক সম্মানহানির ভয়ে বিষয়টি গোপন রাখে। ফলে মনস্তাত্ত্বিক ট্রল, মানসিক উদ্বেগ, বিষণœতা, আত্মবিশ্বাস হারানো, অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটে। নারী সামাজিক ও আর্থিক, ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। করোনা-পরবর্তী সময়ে অনলাইন ভিত্তিক কাজের পরিধি আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী উদ্যোক্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা অনলাইনে কাজ করছেন। সাইবার সহিংসতার শিকার হওয়ার কারণে তাদের অনেকে কর্মক্ষেত্র ছেড়ে দূরে চলে যান। ফলে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন, সম্পদের ওপর তাঁরা অধিকার হারান। এভাবে একদিকে সামাজিক ও পারিবারিকভাবে এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন নারী, অন্যদিকে প্রযুক্তিতে তার প্রবেশ গম্যতা হ্রাস পেতে থাকে, যা জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

প্রযুক্তি সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার পেছনে রয়েছে নারীর প্রতি প্রচলিত অধস্তন দৃষ্টিভঙ্গি, যা সমাজের লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের একটি বহিঃপ্রকাশ। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর পদচারণ যখন নারীর সক্ষমতা ও দক্ষতা প্রমাণ করছে, তখন সহিংসতার এই নতুন মাত্রা নারীর অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। প্রযুক্তিভিত্তিক সহিংসতা এমন একটি মাধ্যম, যার দ্বারা খুব সহজেই দ্রুত অসংখ্য মানুষের কাছে যাওয়া যায়। ফলে অনলাইনে সহিংসতা নারীর জীবনকে আরো বিপর্যস্ত করে তুলছে। এমন বাস্তবতায় স্বাভাবিকভাবে এই প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসে, নারী ও কন্যারা কি প্রযুক্তির ব্যবহারের পথ থেকে দূরে চলে যাবে? কিন্তু এটি তো কেবল প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশ্ন না, এটি মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

নারী আন্দোলন এ ক্ষেত্রে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে মনে করে যে জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রযুক্তিভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে বৈশ্বিক ও জাতীয়ভাবে শক্তিশালী কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন। নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতার পেছনে মৌলিক যে বিষয়টি কাজ করে, তা হচ্ছে সম্পদ ও ক্ষমতার কাঠামোতে নারীর অধিকারহীনতা, যা নারীকে পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অবদমিত করে রাখে। ফলে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ ও নির্মূলে সমন্বিত করণীয় সামনে আসে। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে করণীয় বলতে গেলে নারী ও কন্যাদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি, সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিসহ পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল নৈতিকতা নিরাপত্তা বিষয় যুক্ত করা, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা ইত্যাদি প্রয়োজন। একই সঙ্গে যে আইনগুলো বর্তমানে রয়েছে, তা বাস্তবায়ন সহজ করে তোলা, সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দ্রুত অভিযোগ জানানো যায় এমন হেল্পলাইন ও মোবাইল অ্যাপ চালু করা, সাইবার ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা বৃদ্ধি দরকার। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, অনলাইনে যে বিদ্বেষমূলক ও অশালীন ভাষা, ছবি অবাধে প্রকাশিত হয়, সে ক্ষেত্রে অনলাইন টেকনোলজি কম্পানিকে দায়বদ্ধ করতে হবে, তারা যেন মানবাধিকার নীতিমালার ভিত্তিতে আচরণবিধি ও নীতিমালা গ্রহণ করে। সর্বোপরি নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতার মূল কারণ নারীর প্রতি পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের লক্ষ্যে পুরুষ-তরুণসহ সব ক্ষেত্র ও পেশার নারীদের নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক নারী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

সহিংসতার অনেক ধরন আছে যা ব্যক্তির দ্বারা ঘটে যথা - ধর্ষণ, গৃহ নির্যাতন, যৌন হয়রানি, প্রজননগত জোর-জবরদস্তি, কণ্যা শিশুহত্যা, লিঙ্গভিত্তিক গর্ভপাত, প্রসবকালীন সহিংসতা, উচ্ছৃঙ্খলা জনতার দ্বারা সহিংসতা বা দাঙ্গা, রীতি বা আচারগত চর্চা যেমন সম্মান রক্ষার্থে হত্যা বা অনর কিলিং, যৌতুক সহিংসতা বা পণ মৃত্যু, নারী খৎনা ইত্যাদি ।

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, আইনের কঠোর প্রয়োগ, নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন এবং সহায়তামূলক সেবা গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে হেল্পলাইন নম্বর যেমন ১০৯বা ৩৩৩ নম্বরে (৩ যোগ করে ৩৩৩৩) যোগাযোগ করা যেতে পারে। পুরুষ এবং নারী নির্বিশেষে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে নির্যাতনমুক্ত সমাজ গড়তে। সচেতনতা না বাড়ালে এ পরিস্থিতি কমবে না। নারীকে সমাজের অংশ হিসেবে সমান মর্যাদায় দেখাতে হবে। নারীকে দুর্বল মনে করার প্রবণতা সমাজ থেকে দূর করতে না পারলে সহিংসতা রোধ সম্ভব নয়। পারিবারিক সহিংসতা দমনে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে । সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াই এখন জরুরি মানবিক দায়িত্ব।

আসুন, সবাই মিলে নারী ও কন্যা সন্তানের সুরক্ষা নিশ্চিত করি এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে গড়ে তুলি একটি সুন্দর পৃথিবী। ২৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন সহিংসতা প্রতিরোধ দিবস সফল হোক।

 

রেহানা ফেরদৌসী
সহ সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ,
পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি
(কেন্দ্রীয় পুনাক)
মোহাম্মদপুর, ঢাকা।


মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর