প্রকাশিত:
৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৩:১৪
মানব সভ্যতার ইতিহাসে মহাকাশ অনুসন্ধান এক অনন্য অধ্যায়। NASA-Gi Artemis program সেই অধ্যায়কে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।এরই ধারাবাহিকতায় Artemis II মিশনে চারজন নির্বাচিত নভোচারী চাঁদের কক্ষপথে যাত্রা করবেন, যা মানবজাতির জন্য একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। সৌভাগ্যবান সেই চার জন নভোচারী হলেন ঃ
* রিড ওয়াইজম্যান- মিশনের কমান্ডার হিসেবে তিনি পুরো অভিযানের নেতৃত্ব দেবেন। তিনি একজন অভিজ্ঞ মার্কিন নৌবাহিনীর পাইলট এবং মহাকাশে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। উচ্চতর প্রকৌশল শিক্ষায় শিক্ষিত এই নভোচারী জটিল পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পরিচিত।
* ভিক্টর গ্লোভার- মিশনের পাইলট হিসেবে তিনি মহাকাশযান পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি একজন দক্ষ টেস্ট পাইলট এবং পূর্বে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে কাজ করেছেন। তার প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও শৃঙ্খলা মিশনের সাফল্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
* ক্রিস্টিনা কোচ- তিনি এই মিশনের একমাত্র নারী নভোচারী এবং ইতিহাস গড়তে চলেছেন। দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকার অভিজ্ঞতা তাকে বিশেষভাবে যোগ্য করে তুলেছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তিগত কাজে তার দক্ষতা অসাধারণ।
* জেরেমি হ্যানসেন- তিনি কানাডার প্রতিনিধিত্ব করছেন এবং এই মিশনে অংশগ্রহণকারী প্রথম কানাডিয়ান হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেবেন। একজন সামরিক পাইলট হিসেবে তার দক্ষতা এবং শারীরিক সক্ষমতা তাকে এই দলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্যে পরিণত করেছে।
এই চারজনের মধ্যে সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। সবাই STEM (Science, Technology, Engineering, Mathematics) ব্যাকগ্রাউন্ডের, উচ্চতর ডিগ্রি (Master’s বা সমমান) রয়েছে, সামরিক বা প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। Artemis II মিশনের জন্য নভোযাত্রী হিসেবে প্রস্তুতি গ্রহণে তারা দীর্ঘমেয়াদি কঠোর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তার মাঝে প্রথমেই ছিলো মহাকাশযান প্রশিক্ষণ। Orion spacecraft কিভাবে পরিচালনা করতে হয়, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলা তাদের রপ্ত করতে হয়েছে। শারীরিক ও মানসিক প্রশিক্ষণ এর মাধ্যমে কঠিন পরিবেশে টিকে থাকার কৌশল, শূন্য মাধ্যাকর্ষণ (microgravity) সিমুলেশন, মানসিক চাপ সহ্য করার অনুশীলন শিখতে হয়েছে। সিমুলেশন মিশন বা বাস্তব মিশনের মতো পরিস্থিতি তৈরি করে বারবার অনুশীলন করা, লঞ্চ, কক্ষপথে গমন, পুনঃপ্রবেশ (re-entry) ইত্যাদি তাদের শেখানো হয়েছে। পাশাপাশি টিমওয়ার্ক ও কমিউনিকেশন এর মাধ্যমে ক্রুদের মধ্যে সমন্বয়, গ্রাউন্ড কন্ট্রোলের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার কৌশল দেখানো হয়েছে। দুর্ঘটনায় বেঁচে থাকার (Survival) ট্রেনিং দেয়া হয়েছে যেমন সমুদ্রে অবতরণ হলে কীভাবে বাঁচতে হবে, দুর্গম পরিবেশে উদ্ধার টিম আসা পর্যন্ত টিকে থাকার নিয়ম তাদের জানা রয়েছে। আর এই প্রস্তুতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ Artemis II একটি crewed lunar flyby mission, যেখানে মানুষ প্রথমবার আবার চাঁদের কক্ষপথে যাবে (Apollo যুগের পর)। এক কথায় এই চারজন নভোচারী অত্যন্ত দক্ষ পাইলট, প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানী। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও উচ্চশিক্ষায় সমৃদ্ধ ও কঠোর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক মিশনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এই শক্তিশালী একাডেমিক ও পেশাগত ভিত্তিই তাদের মহাকাশ অভিযানের জন্য উপযুক্ত করে তুলেছে।
মহাকাশে তাদের খাবার বিশেষভাবে প্রস্তুত করে দেয়া হয়েছে। যেমনঃ ফ্রিজ-ড্রাইড (পানি মিশিয়ে খেতে হয়), রেডি-টু-ইট প্যাকেট, টর্টিলা (রুটি টাইপ, কারণ ভাত/রুটির মতো টুকরো ছড়ায় না) ইত্যাদি খাবার দেয়া হয়েছে। পানীয় স্ট্র দিয়ে প্যাকেট থেকে পান করা হয় তবে পানি, জুস, কফিÑসবই সিল করা ব্যাগে থাকে। খাবার যেন ভেসে না যায়, তাই সব কিছু প্যাকেটবন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছে। মহাকাশযানের ভিতরে তারা হালকা ও আরামদায়ক পোশাক (টি-শার্ট, শর্টস/প্যান্ট) ইত্যাদি ব্যবহার করেন কারণ ভিতরে বাতাস ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকে। তার উপর বিশেষ স্যুট Orion Crew Survival Szstem Suit পরিধান করেন। এই বিশেষ পোশাক চাপ (pressure) বজায় রাখে, অক্সিজেন সরবরাহ করে, জরুরি অবস্থায় জীবন রক্ষা করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। মহাকাশযানে বসার জন্য সিটে বেল্ট দিয়ে বাঁধা থাকে যা লঞ্চ ও রি-এন্ট্রির সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। চলাফেরা করার লক্ষ্যে হাঁটা সম্ভব নয় (gravity নেই) তাই হাত দিয়ে ঠেলে ভেসে ভেসে চলতে হয়। একে বলে microgravity movement । মহাকাশে শরীর দুর্বল হয়ে যায়, তাই প্রতিদিন ব্যায়াম বাধ্যতামূলক। ট্রেডমিল (বেল্ট দিয়ে শরীর বেঁধে দৌড়ানো), সাইকেল মেশিন, রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং (ওজনের বিকল্প) ব্যবহার করে দিনে প্রায় ২ ঘণ্টা ব্যায়াম করা লাগে। ঘুমের জন্য তারা দেয়ালে বাঁধা sleeping bag -এ ঘুমায়, বিছানার দরকার হয় না। পানি দিয়ে গোসল সম্ভব নয় তাই ভেজা ওয়াইপ দিয়ে শরীর পরিষ্কার করে। মলমূত্র ত্যাগ করতে বিশেষ vacuum টয়লেট ব্যবহার করে পরবর্তিতে বায়ু প্রবাহ দিয়ে বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ করার জন্য ভিডিও কল, ইমেইল ব্যবহার করছে যার মাধ্যমে পরিবারের সাথে কথা বলা সম্ভব হচ্ছে এছাড়াও NASA থেকে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য প্রফুল্ল্য রাখতে তারা গান শুনছেন, বই পড়ছেন, জানালা দিয়ে পৃথিবী ও চাঁদ দেখছেন...
এই মুহূর্তগুলো তাদের মানসিকভাবে স্বস্তি দেয়। পৃথিবীর মতো জীবনযাপন ভিন্নভাবে মানিয়ে নিয়ে তাদের যাত্রাপথের দশ দিন অতিবাহিত করবেন। Artemis II -এর নভোচারীদের একটি দিন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও শৃঙ্খলা, প্রযুক্তি এবং মানসিক দৃঢ়তার এক অসাধারণ উদাহরণ। তাদের এই জীবনযাপন শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণাকেই এগিয়ে নিচ্ছে না, বরং ভবিষ্যতে মানুষের মহাকাশে স্থায়ী বসবাসের সম্ভাবনাকেও বাস্তবে রূপ দিচ্ছে।
Artemis II -এর এই চার নভোচারী কেবল ব্যক্তি নয়, তারা মানবজাতির সাহস, জ্ঞান ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক। তাদের দক্ষতা, কঠোর পরিশ্রম এবং আত্মত্যাগ ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। মানবতার এই নতুন যাত্রায় তাদের ভূমিকা ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সহ সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ,পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (কেন্দ্রীয় পুনাক) মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
মন্তব্য করুন: